ইঞ্জিনিয়ারিং ছেড়ে সফল কৃষক

0
ad_592-x-60

ফসলি জমির আইল ধরে এগিয়ে যাচ্ছেন এক তরুণ। পরনে টি-শার্ট, ট্রাউজার আর স্নিকার। প্রথম দেখায় অনেকেই ভাববেন হয়তো শহুরে তরুণ গ্রাম ঘুরতে বেরিয়েছেন। আপনিও এমনটি ভাবলে হবে বিরাট ভুল। কারণ এ তরুণ কিন্তু পুরদস্তুর একজন গ্রাম্য কৃষক। তবে ইনি কিন্তু সাধারণ চাষী নন। রীতিমতো ইঞ্জিনিয়ারিং পাস করা চাষী। ভাবছেন হয়তো যে শখের কৃষক। কিন্তু না, তিনি একজন পেশাদার চাষী। ইঞ্জিনিয়ারিং পাসের পর পাওয়া চাকরি ছেড়ে চাষ করে তিনি কত আয় করছেন জানেন কি। প্রতিদিন প্রায় ৪০ হাজার ভারতীয় রুপী।

পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের দিল্লীর পাল্লা গ্রামে জন্ম এই অভিষেক ধাম্মার। তার বাবাও ছিলেন চাষী। পারিবারিক ২৫ একর জমিতে তিনি চাষ করতেন। কিন্তু অভিষেকের স্বপ্ন ছিল ভিন্ন। তাই ছোট থেকেই তিনি চাষবাসের বিরোধী ছিলেন। তার কাছে চাষাবাদের অর্থ ছিল ঘণ্টার পর ঘণ্টার মাঠে রোদের মধ্যে পরিশ্রমের কাজ এবং প্রচুর পরিশ্রমের বিনিময়ে যৎসামান্য কিছু অর্থ। কখনও তা আবার বিনিয়োগের থেকেও কম হতে পারে। তাই বাবার কৃষিকাজে কোন সাহায্যই করবেন না, তা প্রথম থেকেই পরিবারকে ভালভাবে বুঝিয়ে দিয়েছিলেন অভিষেক। নিজের চাকরি এবং ভবিষ্যত নিয়ে সমস্ত পরিকল্পনাও করে ফেলেছিলেন অভিষেক। কিন্তু কী এমন ঘটল যে অভিষেক চাষাবাদে কৌতূহলী হয়ে পড়লেন? এবং একজন চাষী হয়ে গেলেন?

ঘটনার সূত্রপাত ২০১৪ সালে, স্নাতক হওয়ার ঠিক পড়েই। একটা চাকরিও জুটে গিয়েছিল সে সময়ই। কিন্তু হঠাতই মাথায় এসে ভর করল কৃষিকাজ করার চিন্তা। পরিবারকে জানালেন তার চিন্তার কথা। পরিবার পরিজন তাকে নানাভাবে বুঝালেন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে ক্যারিয়ার গড়ে তুলতে। তাছাড়া এ বিষয়ে তার অভিজ্ঞতা বা জ্ঞান কোনটাই নেই। কিন্তু তিনি দৃঢ় প্রতিজ্ঞ।

আসলে চিরকালই নিজের স্বাস্থ্য সম্বন্ধে ভীষণ সচেতন অভিষেক পড়াশোনা শেষে জিম শুরু করার পর ক্রমেই বুঝতে শুরু করেন, সুস্থ থাকার জন্য সঠিক পুষ্টির কতটা প্রয়োজন। তার ডায়েট কিভাবে স্বাস্থ্যকর হয়ে উঠবে, তা নিয়ে বিস্তর গবেষণা শুরু করে দেন তিনি। কিন্তু সমস্যা বাধে অন্যখানে। বাজার যে ভর্তি কেমিক্যাল সার আর কীটনাশক দেয়া শাক-সবজি। আর তাতে যে পুষ্টির পাশাপাশি রয়েছে শরীরের ক্ষতি হবার সমূহ সম্ভাবনা। তাই এ নিয়ে বিস্তর ঘাঁটাঘাঁটি করে মগজাস্ত্রে শান দিয়ে নিজেই নেমে পড়লেন জৈব প্রক্রিয়ায় ফসল চাষে।

চিরকালই নিজের স্বাস্থ্য সম্বন্ধে ভীষণ সচেতন অভিষেক পড়াশোনা শেষে জিম শুরু করার পর ক্রমেই বুঝতে শুরু করেন, সুস্থ থাকার জন্য সঠিক পুষ্টির কতটা প্রয়োজন। তার ডায়েট কিভাবে স্বাস্থ্যকর হয়ে উঠবে, তা নিয়ে বিস্তর গবেষণা শুরু করে দেন তিনি। কিন্তু সমস্যা বাধে অন্যখানে। বাজার যে ভর্তি কেমিক্যাল সার আর কীটনাশক দেয়া শাক-সবজি। আর তাতে যে পুষ্টির পাশাপাশি রয়েছে শরীরের ক্ষতি হবার সমূহ সম্ভাবনা। তাই এ নিয়ে বিস্তর ঘাঁটাঘাঁটি করে মগজাস্ত্রে শান দিয়ে নিজেই নেমে পড়লেন জৈব প্রক্রিয়ায় ফসল চাষে।

খাবারে কীটনাশকের মতো ক্ষতিকর রাসায়নিক এড়ানোর জন্য প্রথমে করলেন ছোট একটা বাগান। যমুনা নদীর তীরে তাদের ছোট একটা জমি ছিল। ঠাকুরদা সেখামে মন্দির করে দিয়েছিলেন। নদীর তীরে হওয়ায় জমির উর্বরতাও ছিল খুব বেশি। নিজেদের চাষাবাদের বিশাল জমির দিকে না গিয়ে বাড়ি থেকে কিছুটা দূরের এই জমিতেই নিজের জন্য জৈব চাষ করতে শুরু করে দেন তিনি। কারণ সঠিক প্রায়োগিক প্রশিক্ষণ বা অভিজ্ঞতা ছাড়া পারিবারিক ২৫ একর জমিতে জৈব চাষে ভরসা পাচ্ছিলেন না তিনি।

এক বছর পর যে ফলন তিনি পেলেন, তার সঙ্গে স্বাদে, রঙে বাজারে বিক্রি হওয়া ফসলের বিস্তর ফারাক তিনি নিজের চোখেই দেখতে পেলেন। সঙ্গে জৈব চাষের অভিজ্ঞতাও হলো। পরিবারকে এবার কিছুটা বুঝাতে সক্ষম হলেন তিনি। তাদের অনুমতি নিয়ে এরপর তিনি পারিবারিক ২৫ একর জমিতে জৈব চাষ করা শুরু করলেন। পাশাপাশি বাড়িতে জৈব সার আর জৈব কীটনাশক বানিয়ে ফসল ফলানোর কাজে ব্যবহার শুরু করলেন তিনি। যদিও অন্য সবাই বার বার তাকে বুঝিয়েছিল বাজারের কেমিক্যাল সার ও কীটনাশক ব্যবহারের জন্য। বুদ্ধি খাটিয়ে প্রযুক্তির প্রয়োগও করলেন তার চাষাবাদে। জমিতে বায়োগ্যাস প্ল্যান্টও লাগিয়েছেন। জমির সমস্ত বর্জ্য দিয়ে বায়োগ্যাস তৈরি করেন এবং সেই গ্যাসেই বাড়িতে রান্না হয়।

পানির ব্যবহার কমানোর জন্য ড্রিপ ইরিগেশনের ব্যবস্থা করেন তিনি। রোজ মাত্র ১৫-২০ মিনিট সময় লাগে তার ২৫ একরের জমির গাছে পানি দিতে আর পানির সাশ্রয় হয় নব্বই শতাংশ আর বিদ্যুত সত্তর শতাংশ পর্যন্ত। যদিও প্রথম বছর সেভাবে বড় কোন খরিদ্দার পাননি তিনি। তবুও দমেননি অভিষেক। পরের বছর থেকে পেয়ে গেলেন বড়সর বাধা খরিদ্দার। এরপর আর পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি তার। প্রযুক্তি আর জৈব সারের প্রয়োগে লাভের অঙ্ক লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়তে শুরু করল তার। এভাবে পাঁচ বছর ধরে সম্পূর্ণ জৈবিক পদ্ধতিকে ফসল ফলিয়ে যাচ্ছেন এই ইলেকট্রনিক্স এ্যান্ড কমিউনিকেশন ইঞ্জিনিয়ার। তো এই পাঁচ বছরান্তে ইঞ্জিনিয়ার থেকে চাষী হয়ে কতটা সুফল পেলেন অভিষেক? তার ভাষ্যমতে স্বাস্থ্য আর অর্থ দুটোই এক সঙ্গে পেয়েছেন অভিষেক। আর তার এই কীটনাশকবিহীন ফসলের চাহিদা দিনকে দিন বেড়েই চলেছে। প্রতিদিন এখন ৪০ হাজার ভারতীয় রুপী উপার্জন তার। আর অচিরেই আরও বেশ কয়েক একর জমি যুক্ত হতে যাচ্ছে তার কৃষি প্রকল্পে, এমনটাই জানিয়েছেন অভিষেক। যে পেশাকে এড়িয়ে চলতেন ছেলেবেলায়, এখন সেটাই গর্বের বিষয় আটাশ বছরের এই আধুনিক যুবকের কাছে।

অতনু রায়

উত্তর দিন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রচার করা হবে না.